দক্ষ প্রজাপতির ২৭ কন্যা, চন্দ্রদেবের রোহিণীর প্রতি পক্ষপাত, এবং তার জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাখ্যা
লেখক – শ্রী কৌশিক বাসুদেব শাস্ত্রী
ভারতীয় পুরাণের বিশাল জগতে, দক্ষ প্রজাপতির ২৭ কন্যা ও তাদের চন্দ্রদেবের সঙ্গে বিবাহের কাহিনী একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পৌরাণিক কাহিনী। এই গল্প শুধু কল্পনা নয়—এর সঙ্গে যুক্ত আছে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বৈদিক জ্যোতিষের গভীর সম্পর্ক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা। এই কাহিনীটি আমাদের শেখায় কিভাবে প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরা রূপকধর্মী পৌরাণিক গল্পের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এইসব মহাজাগতিক ঘটনাবলি কে তুলে ধরতেন।বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞান এই মর্মে উপনীত হয়েছে যে বৈদিক বিপ্রগন আকাশের নক্ষত্র ও চাঁদের গতি লক্ষ্য করতে জানতেন ও তার প্রেক্ষিতে নির্ভুল ভাবে সময়ও ঋতুর হিসাব রাখতেন।
পুরাণের কাহিনী
দক্ষ প্রজাপতি, যিনি ব্রহ্মার মানসপুত্রদের একজন, তাঁর ২৭ কন্যা ছিল। এই কন্যারা ছিলো ২৭টি নক্ষত্র বা নক্ষত্রপুঞ্জের প্রতীক। তিনি তাঁদের সবাইকে চন্দ্রদেবের সাথে বিবাহ দেন এবং নির্দেশ দেন যেন তিনি সবার সঙ্গে সমান সময় কাটান।
কিন্তু পুরাণ অনুযায়ী, চন্দ্রদেব রোহিণী নামক এক কন্যার প্রেমে পড়ে যান। রোহিণী তাঁকে এতটাই আকর্ষণ করেছিল যে তিনি অন্য স্ত্রীদের উপেক্ষা করে বেশিরভাগ সময় তাঁর সাথেই কাটাতে থাকেন। এই অবহেলায় ক্ষুব্ধ হয়ে দক্ষ চন্দ্রকে অভিশাপ দেন—তিনি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবেন বা পূর্ণচন্দ্র ক্ষয় হয়ে“কৃষ্ণপক্ষ” শুরু হবে।
পরবর্তীতে দেবতাদের অনুরোধ ও চন্দ্রের শিবের প্রতি ভক্তিতে, অভিশাপ আংশিক ভাবে উঠে যায়। এর ফলে চাঁদের ক্ষয় হলেও আবার ভগবান শংকরের আশীর্বাদে তার পুনরুত্থান ও বৃদ্ধি শুরু হয়—যা আমরা আজও দেখতে পাই। বলাই বাহুল্য এই কাহিনী একটি রূপকধর্মী সৃষ্টি যেখানে প্রাচীন প্রাজ্ঞ ঋষিকুল পৌরাণিক গল্পের ছলে মহাজাগতিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের মনে রাখার জন্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সম্পর্ক
বৈদিক জ্যোতিষ মতে, চাঁদ ২৭.৩ দিনে পৃথিবীকেএকবার প্রদক্ষিণ করেএবং এই সময় সে ২৭টি নক্ষত্র বা “নক্ষত্রপথ”-এর মধ্য দিয়ে যায়। প্রতিটি নক্ষত্রে সে প্রায় একদিন করে অবস্থান করে। এই ধারাই ভারতীয় চান্দ্র পঞ্জিকার ভিত্তি।
কিন্তু আমরা যদি ভাবি—চাঁদ রোহিণী নক্ষত্রে অন্যদের তুলনায় একটু বেশিক্ষণ থাকে, তাহলে তা সঠিক পর্যবেক্ষন হবে না। এর ব্যাখা ও আসল তাৎপর্য বুঝতে আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে একটু কঠিন মনে হলেও, এর পেছনের সাধারণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটুকু বুঝতে পারলেই ব্যাপারটা অনেক সহজবোধ্য হয়ে উঠবে।
রোহিণী হচ্ছে চতুর্থ নক্ষত্র, যা বৃষ রাশির অন্তর্গত। এখানে চাঁদ থাকে“উচ্চরাশিতে”—মানে তার প্রভাব সবচেয়ে শক্তিশালী হয়। রোহিণী প্রতীক সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা, উর্বরতা ও প্রেমের। চন্দ্রের আবেগময় প্রকৃতির সঙ্গে এই সব গুণের মিল আছে।
প্রাচীন ভারতীয়দের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ
প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা লক্ষ্য করেছিলেন, চাঁদ প্রতিদিন পূর্বদিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র পটভূমিতে উদিত হয়এবং প্রতি ২৭.৩ দিনেএকই অবস্থানে ফিরে আসে। অর্থাৎ চাঁদ প্রতিদিন প্রায় ১৩.২ ডিগ্রি অগ্রসর হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে সেই সভ্যতার উষালগ্নে, মহাজাগতিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করার মত যন্ত্র বা দূরবীন মানুষের কাছে ছিল না। তাই তারা আকাশপথের প্রত্যেকটি ক্ষেত্র কে চিহ্নিত করার জন্য সেই অংশের সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্র কে নাম দেন, ও প্রত্যেকটি নক্ষত্র পৃথিবী ও মানবের ওপর কিরকম ফল দেয় তা লিপিবদ্ধ করেন। মনে রাখতে হবে প্রত্যেকটি নক্ষত্রপুঞ্জের, সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্রটি কে দিয়ে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তারা ৩৬০ ডিগ্রির আকাশপথকে ২৭টি ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগকেএকটি নক্ষত্রের সঙ্গে যুক্ত করেন। এই নক্ষত্রগুলোই দক্ষের ২৭ কন্যা। এই ভাবে নক্ষত্রগুলি কল্পিত চরিত্রের মাধ্যমে সহজে মনে রাখার জন্য একটি মেমোরিক (মনেরাখার ) পদ্ধতি তৈরি হয়। এই গল্প মানুষের মনে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ এবং সময় গণনার গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে।
এই ভাবেই চাঁদের যাত্রা ও নক্ষত্রপথের মাধ্যমে চান্দ্র মাস ও তিথি নির্ধারণ হতো, যা এখনও ভারতীয় ধর্মীয় ক্যালেন্ডারে ব্যবহৃত হয়।
রোহিণীর প্রতিচন্দ্রের পক্ষপাত – আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা
প্রাচীন ঋষিরা দেখেছিলেন যে চাঁদ একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে, যাকে বর্তমান বিজ্ঞানে বলা হয় ইক্লিপটিক (ecliptic)।
এই ইক্লিপটিকের কাছাকাছি কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের সঙ্গে চাঁদের ঘন ঘন যোগাযোগ ঘটে। এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক নাম হলো লুনার অকালটেশন (Lunar Occultation)—যেখানে চাঁদ পৃথিবীর দৃষ্টিকোণ থেকেএকটি নক্ষত্র কে ঢেকে দেয়।
রোহিণী বা পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের ভাষায় Aldebaran নামের নক্ষত্রটি ইক্লিপটিকের খুব কাছাকাছি (প্রায়৫ ডিগ্রি)। এই কারণে, চাঁদ প্রায়ই এই নক্ষত্রকে আংশিক বা পুরোপুরি ঢেকে দেয়—অর্থাৎ রোহিণী তে লুনার অকালটেশন বেশি ঘটে।
বিজ্ঞান বলে: যে নক্ষত্রগুলো ইক্লিপটিকের ৪–৬ ডিগ্রির মধ্যেঅবস্থিত, তাদের সাথে চাঁদের লুনার অকালটেশন বেশি ঘটে। এই ধরনের ঘটনার একটি ১৯ বছরের পুনরাবৃত্ত চক্র আছে, যাকে বর্তমানে বলা হয় মেটোনিক চক্র (Metonic Cycle)।এই মেটোনিক চক্র (Metonic Cycle) এর প্রেক্ষাপটে হিসাব করলে চাঁদের রোহিণী নক্ষত্রের সাথে লুনার অকালটেশন অন্য নক্ষত্রের তুলনায় অনেক বেশি ঘটে।
এই ঘন ঘন “সাক্ষাৎ” বা কাছে আসা থেকেই পুরাণে জন্ম নিয়েছিল গল্প—চন্দ্র কেন রোহিণীর প্রতি পক্ষপাত দেখান।
বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির হেতু আজ আমরা অনেক না জানা সত্য কে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নতুন করে উপলব্ধি করছি যা হয়তো আগে আমরা গল্প বা অন্ধবিশ্বাস বলে উপহাস করতাম।
উপসংহার
চন্দ্রদেব ও রোহিণীর প্রেম, দক্ষের অভিশাপ এবং চন্দ্রের উচ্চ রাশি রোহিণীতে অবস্থান—সব মিলিয়ে পুরাণ, জ্যোতিষ এবং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ গড়ে তোলে। এই কাহিনী শুধু রূপকথা নয়—এটি একটি সময়জ্ঞান, দিক নির্দেশনা ও নক্ষত্র বিজ্ঞান। মনে রাখতে হবে যে প্রাচীন বৈদিক জ্ঞান ‘অপৌরষেয়’ মানে কোনও নশ্বর মানবের সৃষ্ঠ বা উপলব্ধ নয়, এই জ্ঞান মহাজগতের উচ্চ মাত্রিক ব্রহ্ম জ্ঞানের আধার যা হয়তো মানুষ কে কৃপা বশত, আমাদের থেকে অনেক অনেক উন্নত কেউ দান করেছিলেন। সে প্রশ্ন তর্ক সাপেক্ষ, সে নিয়ে কোনও অন্য একদিন আবার কিছু লেখার আশা রইল।
ভাল থাকবেন সব্বাই, মনে রাখতে হবে আমরা সেই অমৃতের সন্তান, যাদের এই পৃথিবীর কামনা কলুষের ধূলি খেলায় দুদিন কাটিয়ে আবার সেই অমৃত লোকেই ফিরে যেতে হবে। তাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।
……..শৃণ্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা…….
